Showing posts with label থ্রিলার. Show all posts
Showing posts with label থ্রিলার. Show all posts

Saturday, 4 May 2019

A silent patient(1)


                                                                                                                ভূমিকা

এলিশিয়া বেরেনসন এর ডায়রি 


১৪ জুলাই

কেন এই ডায়রিটা লিখছি আমি? জানি না।
কথাটা সত্যি নয়। হয়ত জানি,কিন্তু স্বীকার করতে চাচ্ছিনা।
এই যে লিখছি,এটাকে কি বলব তা জানা নেই। ডায়রি বললে সেটা বেশি বেশি হয়ে যায়। এমন না যে, আমার বলার কিছু আছে। অ্যানি ফ্রাঙ্ক ডায়রি লিখত, আমি ত তার মত নই। জার্নাল বললে শিক্ষামূলক কিছু মনে হয়, কাজেই সেটাও বাদ। প্রত্যেকদিন হয়ত লিখতে পারবনা, সম্পূর্ন ইচ্ছের ওপর সেটা নির্ভর করে। চাপ মনে হলেই এই লেখা ছেড়ে দেব।

এটাকে কোনো নাম দেয়াই ভাল। বেনামি কোনকিছু, যাতে মাঝেমধ্যে আমার মনের কথাগুলো লিখি, হ্যাঁ, শুনতে এটাই বেশ ভাল লাগছে। কোনোকিছুর নামকরন করলে সেটার গুরুত্ব অনেকখানি কমে যায়। নামের ওপর আমাদের বেশি নজর থাকে, যা কেবল সম্পূর্ন জিনিসের অতিক্ষুদ্র একটা অংশ। শব্দের ব্যবহারে আমি ঠিক পারদর্শী নই। সবসময় ছবির মাধ্যমে নিজের ইচ্ছে ব্যক্ত করি। গ্যাব্রিয়েল জোরাজুরি না করলে হয়ত লেখালেখি শুরুই করতাম না।
কদিন ধরে কিছু বিষয় নিয়ে মনমরা হয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, ব্যাপারটা কারো চোখে ধরা পড়েনি, কিন্তু সে ঠিকই টের পেয়েছিল। কোনোকিছুই তার চোখ এড়ায় না। ছবি আঁকাআঁকি কেমন চলছে, কথাটার উত্তরে তাকে বললাম, কাজ আগাচ্ছে না। কারন, কাজটা আমি করছিই না। সে আমাকে একগ্লাস ওয়াইন এনে দিল। সে যখন রান্না করছিল, আমি তখন চুপচাপ ডাইনিং টেবিলে বসেছিলাম।
রান্নাঘরে গ্যাব্রিয়েলকে বেশ মানায়। সে বেশ দক্ষ একজন পাচক, একই সাথে সে মার্জিত,নম্রভদ্র ও সাজানো গোছানো চরিত্রের। আমি ত রান্নাঘরে গেলেই গন্ডগোল পাকিয়ে বসি!
“ সব আমাকে খুলে বল। ” সে বলল।
“ বলার মত কিছু নেই। মাঝেমধ্যে মাথায় অনেক কিছু গোল পাকিয়ে যায়, তখন মনে হয় পুরু কাদার মধ্য দিয়ে কষ্ট করে সাঁতারের চেষ্টা করছি।
“ কথা বলতে সমস্যা হলে সেটা কোনো ডায়রিতে লিখে রাখা শুরু কর। পরে ব্যাপারটা কাজে লাগতে পারে। ”
“ ঠিক বলেছ। আচ্ছা, এই অভ্যাসটা গড়ে তুলব। ”
“ বলে নয় ডার্লিং , বরং কাজটা করে দেখাও। ঠিক আছে? ”
 “ আচ্ছা, করব। ”
সে আমাকে বারবার জ্বালাতন করতে লাগলো কাজটা করার জন্য। তবুও শুরু করিনি। এই ত, কদিন আগে সে আমাকে একটা ছোট নোটবুক উপহার দিল। প্রথম দেখাতেই কালো চামড়ায় মোড়ানো আর পুরু সাদা কাগজের নোটবুকটা পছন্দ হয়ে গিয়েছিল । প্রথম পৃষ্ঠাতে হাত বোলালাম, এত মসৃণ! পেন্সিল শার্প করে তক্ষুনি বসে পড়লাম।
সে ঠিকই বলেছিল। ইতোমধ্যে আমি ভাল বোধ করছি। কথাগুলো লেখার সাথে সাথে কাঁধ থেকে যেন ক্লান্তি ঝরে যাচ্ছে। নোটবুকটা আমার স্বাধীনতার জায়গা হয়ে দাড়িয়েছে। অনেকটা থেরাপির মত।
গ্যাব্রিয়েল সরাসরি কথাটা বলেনি, কিন্তু সে আমার জন্য অনেক চিন্তিত ছিল। আর সত্যি বলতে কী, হ্যাঁ, সত্যটাই বলা উচিত আমার, ডায়রিটাতে লিখছি তাকে আশ্বাস দেবার জন্য যে, আমি ঠিক আছি। আমি তাকে কোনোভাবেই কষ্ট দিতে চাইনা। গ্রাব্রিয়েলকে আমি প্রচন্ড ভালবাসি। সে আমার জীবনের ভালবাসা, তাতে সন্দেহ নেই। আমি তাকে পুরোপুরি মন দিয়ে ভালবাসি। মাঝেমধ্যে এত ভালবাসি যে, সেটা আটকে রাখতে পারিনা নিজের মধ্যে। মাঝেমধ্যে মনে হয়.........
না, সে কথাটা লেখা যাবেনা এখানে।
ডায়রিটা আমার জীবনের সব সুখকর চিন্তা, আমাকে শৈল্পিকভাবে অনুপ্রাণিত করা সকল ছবি, এমনকি আমার মনে সৃষ্টিশীলতা জাগিয়েছে – সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকবে। এটাতে কেবল আমার সুখকর অনুভূতিগুলোর কথাই থাকবে।
কোনো পাগলামোর চিহ্ন আমি এতে রাখব না ।







                                                                        প্রথম খন্ড





“ যার চোখ আছে সে দেখতে পায়, কান আছে সে শুনতে পায়,
   নিজেকে বোঝায়, কোনো মানুষ গোপন কথা লুকিয়ে রাখতে পারেনা।
   মুখ বন্ধ থাকলেও তার আঙ্গুল এর প্রতিটা লোমকূপ থেকে,
    সে সত্যটা বেরিয়ে পড়ে। ”

-         সিগমুন্ড ফ্রয়েড, Introductory Lectures on Psychoanalysis









                                                                                                                              অধ্যায় ১


এলিশিয়া বেরেনসন এর বয়স যখন ৩৩, তখন সে তার স্বামীকে নিজ হাতে খুন করেছিল।
তারা প্রায় সাত বছর ধরে বিবাহিত ছিল। দুজনেই শিল্পী ছিল, এলিশিয়া ছিল পেইন্টার, গ্যাব্রিয়েল ছিল একজন জনপ্রিয় ফ্যাশন ফটোগ্রাফার। তার ছবি তোলার ধরনটাই ছিল আলাদা। অর্ধনগ্ন, অভুক্ত মেয়েদের অনাকর্ষনীয় ভাবে ছবি তোলাতে পারদর্শী ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর তার তোলা ছবিগুলোর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তার ছবিগুলো আমার কখনোই ভাললাগেনি। বরং সেগুলোর বিষয়বস্তু আমার কাছে কৃত্তিম ও চটকদার বাদে আর কিছুই মনে হয়নি। এলিশিয়া বেরেনসন এর সেরা কাজগুলোর সৌন্দর্যের কাছে কোনোভাবেই সেগুলো দাঁড়াতে পারবেনা। আর্ট বোঝার মত ক্ষমতা আমার নেই, তাই আমি বলতে পারছিনা সময়ের কঠিন স্রোতে এলিশিয়ার ছবিগুলো টিকে থাকবে কিনা। তবে তার কুখ্যাতির আড়ালে তার ছবিগুলো চাপা পড়ে যাবে, সন্দেহ নেই। আর ছবিগুলোর প্রশংসা করলে আমাকে হয়ত বলে বসবেন, আমি তার পক্ষপাতিত্ব করছি। আমি কেবল আমার মতামতটাই জানাতে পারব। আর তাই আমার চোখে এলিশিয়া একজন প্রতিভাবান শিল্পী। তার ছবিগুলোর নিখুঁত সৌন্দর্যের কথা না হয় বাদই দিলাম, ছবিগুলোর মধ্যে এমন একটা ক্ষমতা আছে, যেটা দর্শকের মন কেড়ে নেয়, টেনে ধরে রাখে।
গ্যাব্রিয়েল বেরেনসনকে ছয় বছর আগে হত্যা করা হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল বিয়াল্লিশ। আগস্টের পঁচিশ তারিখে, প্রচন্ড গরমের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। সে বছর আসলেই অনেক গরম পড়েছিল। আবহওয়া অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী, সেটি ছিল সবচেয়ে উষ্ণতম তাপমাত্রাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম দিনে সে মারা গিয়েছিল।
মৃত্যুর দিন গ্যাব্রিয়েল খুব সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেছিল। সকাল ৫.১৫ এর দিকে একটি গাড়ি তাদের স্বামী স্ত্রী দুজনকে তুলে নেয় উত্তর-পশ্চিম লন্ডন থেকে, হ্যাম্পস্টেড হিথ এর কাছ থেকে। গাড়িটা তাকে শোরেডিচ* এর একটি ফটোগ্রাফি শুটিং এ নিয়ে যায়। সেখানের ছাদে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের জন্য মডেলদের ছবি তুলেই তিনি সারাদিন পার করেন।
এলিশিয়া এ সময় কী করেছিলো, তা জানা যায়নি। সামনেই তাঁর ছবির প্রদর্শনী ছিল,অথচ সে কাজে পিছিয়ে ছিল। ধরে নেয়া হয়েছিল, সে সারাদিন তাদের বাগানের শেষ মাথায় অবস্থিত সামারহাউজে ছবি এঁকেই সময় পার করেছে। সামারহাউজটাকে এলিশিয়া কাজের প্রয়োজনে স্টুডিওতে রূপান্তর করে নিয়েছিল। গ্যাব্রিয়েলের কাজ শেষ হতে দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় এগারটা বেজে গিয়েছিল।
এর প্রায় আধাঘন্টা পর তাদের প্রতিবেশী, বারবি হেলম্যান অনেকগুলো গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ শুনতে পান। সাথে সাথে তিনি পুলিশকে ফোন করেন। হ্যাভারস্টক হিল পুলিশ স্টেশন থেকে তক্ষুনি একটি পুলিশের গাড়ি বেরিয়ে পড়ে। মাত্র তিনমিনিটের মাথায় সেটি এলিশিয়াদের বাসার গেটে পৌঁছায়।
সদর দরজা খোলা ছিল। পুরো বাড়িটাই ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন; একটা সুইচও কাজ করছিল না। পুলিশ অফিসাররা হলওয়ে পার করে তাদের বেডরুমে উপস্থিত হলেন। টর্চ লাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে গেল গোটা রুম। ফায়ারপ্লেসের পাশেই এলিশিয়া দাঁড়িয়ে ছিল। টর্চের আলোয় তাঁর সাদা ড্রেসকে ভৌতিক বলে মনে হচ্ছিল। পুলিশ যে এসেছে, তা যেন নজরেই আসেনি এলিশিয়ার। স্থির হয়ে, অনেকটা বরফের মূর্তির মত বিভ্রান্ত,ভয় পাওয়া মুখে সে দাঁড়িয়ে ছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, ভয়ংকর কিছু একটা ঘটে গিয়েছে।
মেঝেতে একটা পিস্তল পড়ে ছিল। পাশেই, আলোছায়ার মধ্যে, গ্যাব্রিয়েল অচেতন অবস্থায় একটা চেয়ারে তার দিয়ে আষ্টেপিষ্টে বাঁধা ছিল। প্রথমে অফিসাররা ভেবেছিলেন, সে বেঁচে আছে। মাথাটা একপাশে ঠেস দিয়ে রাখায় তাকে অচেতন বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু টর্চের আলো তার ওপর ফেলানোর সাথে সাথে সত্যটা বেরিয়ে পড়ল। গ্যাব্রিয়েলের মুখে বেশ কয়েকবার গুলি করা হয়েছে। তার সুন্দর চেহারা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল, পেছনে ফেলে গেল কুৎসিত,কালো কুচকুচে,রক্তাক্ত একদলা মাংস্পিন্ড।
চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, দেয়ালে একেবারে ছিটকিয়ে লেগেছে। মেঝেতে রক্তের ছোট ছোট স্রোত কাঠের মেঝের ফাঁকে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। অফিসাররা প্রথমে ভাবলেন, সেটা গ্যাব্রিয়েলের রক্ত, কিন্তু এত রক্ত দেখে সন্দেহ হল। মেঝেতে কি যেন টর্চের আলোতে ঝিকমিক করে উঠল। দেখা গেল, এলিশিয়ার পায়ের কাছেই একটি ছুরি পড়ে আছে। টর্চের আলোয় আরো দেখা গেল, এলিশিয়ার সাদা ড্রেসে রক্তের দাগ লেগে আছে। একজন অফিসার এগিয়ে গিয়ে তার হাত শক্ত করে ধরলেন এবং আলোর কাছে আনলেন। দুহাতেই কব্জির কাছে ধমনী পর্যন্ত গভীর ভাবে কাটা, সেখান থেকে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে।
এলিশিয়া অনেকক্ষন মরে যাবার জন্য ধস্তাধস্তি করল পুলিশ অফিসারদের সাথে। তিনজনের মত পুলিশ লাগল তাকে শান্ত করতে। তাকে প্রথমে রয়াল ফ্রি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, কয়েক মিনিটের মধ্যে পড়ে হাসপাতালটি। নিয়ে যেতে যেতে অচেতন হয়ে পড়ে এলিশিয়া। অনেক রক্ত হারিয়েছে, তবে সে বেঁচে গিয়েছে।
পরের দিনই , হাসপাতালের একটি প্রাইভেট রুমে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। এলিশিয়ার উকিলকে সামনে রেখেই পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল। পুরো সময় জুড়ে এলিশিয়া চুপচাপ ছিল। তার ঠোঁট ছিল ধূসর, প্রাণহীন,রক্তাক্ত। মাঝেমধ্যে তার ঠোঁট নড়ছিল, কিন্তু সে যে কী বলছে, তা উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছিল না। সে কথা বলতে চাইছিল না, বলতেও পারছিলনা। তাকে গ্যাব্রিয়েলের খুনের দায়ে অভিযুক্ত করার পরেও সে কিছু বলেনি। এরেস্ট করার পুরো সময়টাতেই সে নীরব ছিল। সে খুন করেছে কি করেনি, তা নিয়ে একবারো প্রতিবাদ করেনি।
এরপর এলিশিয়া একটি শব্দও উচ্চারন করেনি।
তার এই নিঃস্তব্ধতা পুরো কাহিনিটিকেই সাধারন খুন থেকে আরো বড় কিছুতে পালটে দেয়। গোটা ব্যাপারটি একটা রহস্যে পরিণত হয়। মাসের পর মাস সেটি পত্রিকার হেডলাইন দখল করে নেয়, আমজনতার মনোযোগ কেড়ে নেয় বেশ অনেকদিনের জন্যই।
এলিশিয়া পুরো সময়টাই বোবার মত ছিল, তবে একটা কাজই সে করেছিল সে সময় জুড়ে। একটা পেইন্টিং। তাকে যখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া হয়, তখন সে পেইন্টিং টা শুরু করে। হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড়া হয়েছিল গৃহবন্দি বা হাউজ এরেস্ট এর ট্রায়ালের জন্য। সে সময়ে তার জন্য নিয়োযিত নার্স জানিয়েছিল, সে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে কেবল পেইন্টিং টাই করে গিয়েছে।
সাধারনত নতুন একটা পেইন্টিং সম্পন্ন করতে এলিশিয়ার সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেত। একগাদা স্কেচ,ছবিটাকে বিভিন্নভাবে সাজান, রঙ দিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা ইত্যাদি করেই সময় কেটে যেত। একেকটা তুলির পোচে যেন সে নতুন কিছুর জন্ম দিত । কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর তার গোটা প্রক্রিয়াটাই নাটকীয়ভাবে পালটে গেল, মাত্র কদিনের মধ্যেই পেইন্টিং টা শেষ হল।
তার এ আমূল পরিবর্তন মোটামুটি সকলের কাছেই উদ্ভট লাগল। প্রায় সকলেই স্বামীর মৃত্যুর মাত্র কদিন পরেই তার পেইন্টিং এ ফিরে যাওয়াকে অনুভূতিহীনতার লক্ষণ বলে ধরে নিল। এরকম অনুভূতিহীনতা কেবল ঠান্ডা মাথার খুনীর চরিত্রের সাথেই মিলে।
হয়তো সে খুনি। কিন্তু এটা ভুললে চলবেনা, সে খুনি হলেও সবার আগে একজন শিল্পি।তার ভেতরে স্বামীর মৃত্যুর ফলে সে অনুভূতির জন্ম নিয়েছে, হয়ত সে তা কেবল ক্যানভাসেই ফোটাতে পারবে।নিজের কষ্টটা ফুটিয়ে তোলার জন্য একজন পেইন্টারের কাছে রঙতুলি বাদে আর কোনো সহজ মাধ্যম নেই।
ছবিটা ছিল একটা আত্মপ্রকৃতি। বাম দিকের কোণে হালকা আকাশী নীল অক্ষরে একটি গ্রীক শব্দ সেখানে লেখা ছিল।
একটাই শব্দ।
এলসেসটিস ( Alcestis ) ।      


Saturday, 9 March 2019

In the Miso soup-2



“ হাই, ফ্রাংক ।”  হাতের পত্রিকাটা টেবিলে ফেলে ফোনটা ভালমত ধরে বললাম । “কেমন  চলছে ভ্রমন ? ”

“ ভালই চলছে । আপনার  বিজ্ঞাপনটা একটা ম্যাগাজিনে দেখার পর ভাবলাম , আপনাকে ভাড়া করলে আপনি আমাকে আশপাশ ঘুরিয়ে দেখাতে পারবেন । ”

“কোন ম্যাগজিন? টোকিয়ো পিঙ্ক গাইড নিশ্চয়ই ?”

“আশ্চর্য, আপনি কিভাবে বুঝলেন ?"

“আসলে কেবল ওটাতেই আমি বিজ্ঞাপন দিই। ”

-“ওহহো, তাই বলুন ! তাহলে ,  আমি কি আপনাকে আজ থেকে শুরু করে তিন রাতের জন্য ভাড়া করতে পারি ?”

“ আপনি কি একলা এসেছেন , নাকি সাথে একটা গ্রুপ আছে ?”

“ আমি একলাই । সেটাতে কি কোনো সমস্যা হবে ? ”

“ না , সমস্যা নয় , বরং আমার ফি টা একজন মানুষের জন্য একটু ব্যয়বহুল – ১০০০০ ইয়েন , সন্ধ্যা ছটা থেকে রাত নয়টা ; ২০০০০ ইয়েন , রাত নটা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এবং মধ্যরাতের পর ঘন্টাপ্রতি আমি ১০০০০ ইয়েন করে চার্জ করি । কোনোপ্রকার ট্যাক্স নেই , কিন্তু আপনি আমার সকল ধরনের খরচ , খাবার এবং ড্রিংক্স এর ব্যয়ভার বহন্ করবেন  । ”

“ সেটা ঠিক আছে । তাহলে যদি আপনি রাজি থাকেন,  আমি আপনার নটা থেকে মধ্যরাত এর কোর্সটা বেছে নিলাম  , আগামী তিনদিনের জন্য । ”

তিন রাত,  ফলে নিউ ইয়ারস ইভ*  এর মধ্যে পড়ে যাচ্ছিল – এবং তার ফলে আমার একটা ছোট্ট সমস্যা দেখা দিয়েছিল । আমার গার্লফ্রেন্ড , জুন— জানিয়ে রাখি, হাইস্কুলের একটা মেয়ে ( যে কিনা আমার কাজের বিরোধী ! ) সে আমাকে দিয়ে ওয়াদা করিয়েছিল যে , আমি অন্তত ঐ রাতটা তার সাথে কাটাবো । সে ব্যাপারটা একেবারেই পছন্দ করেনি , কারন সে আমাকে আগেরদিনই একেবারে কঠিন প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল আমাকে দিয়ে, যাতে নিউ ইয়ারের কাউন্ট ডাউনের সময় আমরা একসাথে থাকতে পারি । জুন রেগে গেলে তার মন ভাঙ্গানো বেশ কঠিন কাজ , কিন্তু আমার কাজটা দরকার ছিল । দুবছর ধরে এ কাজে লেগে আছি , তবুও যত টাকা জমা  হবার কথা ছিল , তা হয়নি । তাই ফ্রাঙ্ক কে আমি হ্যাঁ জানিয়ে দিয়েছিলাম কাজের ব্যাপারে ; নিজেকে বুঝ দিচ্ছিলাম এই বলে যে, আমি রাতে কাউন্টডাউন শুরু হবার কিছুক্ষন আগেই কোনো অযুহাত দিয়ে কেটে পড়ব ।  


“ তাহলে আমি আপনার হোটেলে নটার দশমিনিট আগেই উপস্থিত হব ।  ”

- - - - - - - - - - - - - - - -  - - - - -                       --------------------------------------------------------------------------
ফ্রাংক এক বোতল বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে হোটেলের লবির পাশের ক্যাফেটেরিয়াতে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল । সে নিজের চেহারার বর্ননা দিতে গিয়ে বলেছিল , সে সাদাটে , আর দেখতে অনেকটা এড হ্যারিস* এর মত , এবং সে নাকি একটা নেকটাই পড়ে থাকবে , যার মধ্যে সাদা বকের ছোপ থাকবে । অতকিছু খুজতে হয়নি , কারন সেই ওখানকার একমাত্র বিদেশি খদ্দের ছিল, যার ফলে খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ হয়নি । তবে তার চেহারার সাথে এড হ্যারিস এর মিল খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি আমি , কারন কোনো দিক থেকেই তাকে তা মনে হচ্ছিলনা ।

“ তাহলে আমরা এখন থেকেই শুরু করতে পারি ? ” সে জিজ্ঞেস করল ।

“ সম্পূর্নটাই তোমার উপর, ফ্রাঙ্ক । কিন্তু আগে  যদি তোমার কোনো প্রশ্ন থেকে থাকে , এখন সেগুলো বলে ফেলার সবচেয়ে ভাল সময় । কারন ম্যাগাজিন থেকে  তুমি টোকিওর ‘রাত্রিজগত’ এর সম্পর্কে কোনো ধারনাই পাবেনা । ”

“ শুনে বেশ ভাল লাগল ।  ”

“ কোনটা ? ”

“ এই যে, ‘টোকিওর রাত্রিজগত’ --- শব্দটাই কেমন যেন উত্তেজনা জাগায় , তাইনা ?  ”


ফ্রাঙ্ককে দেখে আমার কোনোভাবেই মনে হয়নি সে একজন এস্ট্রোনাট* কিংবা সৈনিক – যেসব চরিত্রে এড হ্যারিস অভিনয় করে আরকি । বরং তাকে সাধারন স্টকব্রোকার বা ওই টাইপের কিছু মনে হয়েছে । তারমানে এই না যে, আমি স্টকব্রোকাররা কেমন দেখতে, তাদের আচার-আচরন  – তা জানি । বরং,  আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম , তাকে আমার  সাদামাটা এবং বিশেষত্বহীন মনে হয়েছিল ।

“ তোমার বয়স কত , কেঞ্জি ? ”

“ বিশ । ”

“ তাই ? আমিও তাই ধরেছিলাম । কিন্তু আমি শুনেছিলাম , জাপানিজদের বয়স বোঝা ভার ।  ”


শহর থেকে ডিস্কাউন্টে পেয়ে আমি দুটো স্যুট কিনেছিলাম , এবং ওগুলোর যেকোনো একটা পরেই আমি কাজে চলে আসতাম । শীতের সময় , মানে এখনকার মত, আমার একটা ওভারকোট আর মাফলার লাগত । চুলের দৈর্ঘ্য স্বাভাবিক ছিল , চুলে কোনোধরনের রঙ ব্যবহার করতাম না , এমনকি শরীরের কোথাও ছিদ্রও করাইনি – যা কিনা এই জগতে অস্বাভাবিক ছিল । ক্লাবগুলো অবশ্য আবার অই ধরনের অস্বাভাবিক চেহারার মানুষগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকে ।

“ আর আপনি, ফ্রাংক ? আপনার বয়স.....? ”

“ পয়ত্রিশ চলছে ।  ” বলে সে একটু মুচকি হাসল ।


তখনই তার মুখের একটা বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ল । খুবই সাদামাটা একটা চেহারা , কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার , তার চেহারা দেখে তার বয়স বোঝার সাধ্য নেই । একবার মনে হবে তার বয়স বিশের ঘরে, পরমুহূর্তেই সেটা মনে মনে কেটে দিয়ে বয়স্টাকে চল্লিশ বা পঞ্চাশের ঘরে ফেলতে মন চাবে । এখন পর্যন্ত প্রায় দু’শর মত ট্যুরিস্টদের সাথে কাজ করেছি,অধিকাংশই আমেরিকান ছিল – কিন্তু কখনই এরকম চেহারার কাউকে দেখিনি ।

বেশ কিছুক্ষন পরে কারনটা আমি ধরতে পারলাম । সেটা হল তার চামড়া , বিশেষ করে মুখের চামড়া । সেটাকে দেখে অনেকটা কৃত্তিম বলে মনে হচ্ছিল, যেন মুখটা কোনো একসময় পুড়ে গিয়েছিল এবং ডাক্তাররা সেটাকে প্রায় আসলের মত দেখতে কোনো উপাদান দিয়ে আবার গড়ে দিয়েছে । কি কারনে জানিনা, আমার মনে সেই আর্টিকেলটার কথা মনে পড়লো, যেটাতে খুন হওয়া স্কুলের মেয়েটার খবর ছিল ।

কফিতে আবার চুমুক দিলাম । “ কবে জাপান এসেছেন আপনি ? ”

গত পরশু, ফ্রাঙ্ক জানালো । সে তখন খুব ধীরে ধীরে বিয়ারের গ্লাসটা খালি করছিলো । প্রথমে সে আলতো করে গ্লাসটা মুখ পর্যন্ত এনে সেটার ফোমগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে সেটা থেকে এক চুমুক নিচ্ছিল এবং মুখভঙ্গি এমন করছিল যেন, কোনো বিস্বাদ ওষুধ খাচ্ছে সে । আচার আচরন দেখে মনে হল , মহা এক কঞ্জুসের / কৃপণের পাল্লায় পড়েছি আমি । সাথে সাথে আমার ‘টোকিয়োর গাইড’ বুকের একটা প্যারাগ্রাফ/অনুচ্ছেদের কথা মনে পড়ে গেল । গাইড বুকটা অধিকাংশ আমেরিকান ট্যুরিস্টরাই ব্যবহার করত ।

সেটাতে লেখা ছিল – “কখনোই কোনো হোটেলের রেস্তোরায় খাবেন না । আশেপাশে তাকালেই চারদিকে অনেক  ফাস্ট ফুডের দোকান পাবেন , সেখান থেকেই পারলে দুয়েকটা বার্গার খেয়ে নিবেন । যদি কারো সাথে দেখা করতে কোনো হোটেলের রেস্টুরেস্টে যেতেই হয় , তবে সেখানে একটা দুটা বিয়ার খেতে খেতে সময় পার করবেন । কফির গলাকাটা দামের জন্য ওটা এড়িয়ে যাওয়াই ভাল । কিন্তু আপনার যদি খুবই ইচ্ছে করে জাপানের গলাকাটা দামের সাথে পরিচিত হবার জন্য; তাদের আর কিছু লাগবেনা, বরং যেকোনো হোটেল এর রেস্টুরেন্টে গিয়ে কেবল এক গ্লাস ফ্রেশ কমলার জুস অর্ডার দিয়ে বসে পড়বেন । গ্লাসের কুলার/ছোট ফ্রিজ থেকে আপনাকে যে জ্যুস আপনাকে খেতে দিবে , তাতে সাক্ষাৎ আপনার কাছ থেকে কমপক্ষে আট কিংবা পনেরো ডলার কেটে রেখে দিবে । জয়তু, জাপানিজ গভর্মেন্টের ট্যাক্স সিস্টেম !


“ আপনি কি এদেশে  কোনো কাজে এসেছেন ?  ”

“ তা ত অবশ্যই ।  ”

“সেটা কি....ভালমত চলছে ? ”


“ আমি ত বলি, ভালই হচ্ছে । আমি দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া থেকে টয়োটা গাড়ির রেডিয়েটর আমদানি করি । সেটারই চূড়ান্ত লাইসেন্স এর চুক্তি করতে আমি এ দেশে এসেছি । ইতিমধ্যেই কয়েকটা ইমেইলের আদান-প্রদান করে কাজটা একদিনে খতম করে ফেলেছি আমরা  , কাজেই আর কি বলব ! নিখুঁতভাবেই শেষ হয়েছে সব কাজ । ” 





অনুবাদকের কথা--

* নিউ ইয়ারস ইভ -- নতুন বছর শুরু হবার আগের দিন সন্ধ্যা । 

* এড হ্যারিস - আমেরিকান এক্টর, যদি সিনেমা বা সিরিয়ালের জগতে পা দেয়া থাকে আপনার নিশ্চিত চিনবেন উনাকে ! যদি না চেনা থাকে , তবে সাজেশন থাকবে-- দ্য ট্রুম্যান শো , ওয়েস্টওয়ার্ল্ড সিরিজ দেখার ! 


* এস্ট্রোনাট -- নভোচারী , যারা মহাশুন্যে বা স্পেস স্টেশনে কাজ করেন । 




আরো যা দেখতে পারেন